দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে, তা নিয়ে অভিভাবকের দুশ্চিন্তা থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে বন্ধুত্বের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলার দক্ষতা শেখানোই বেশি কার্যকর। মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, এ ক্ষেত্রে বাবা-মা ও অভিভাবকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) প্রধান বিজ্ঞান কর্মকর্তা ও শিশুদের সমবয়সীদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণাকারী মিচ প্রিনস্টেইনের মতে, অনেক অভিভাবক মনে করেন, সন্তান নিজের মতো থাকুক, যতক্ষণ সে বাড়ি ফিরে অভিভাবকের কথা মেনে চলছে ততক্ষণই যথেষ্ট। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, ছোটবেলায় সহপাঠীদের কাছে গ্রহণযোগ্য শিশুরা তুলনামূলকভাবে ভালো থাকে। অন্যদিকে নেতিবাচক সহপাঠী-সম্পর্ক আক্রমণাত্মক আচরণ ও আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়ার মতো প্রবণতা তৈরি করতে পারে।
তাই সন্তানকে সামাজিকভাবে দক্ষ করে তুলতে বয়স অনুযায়ী কিছু অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন প্রিনস্টেইন।
ছোটবেলা থেকেই শুরু করুন
সামাজিক দক্ষতা শেখানোর কাজ শুরু হতে পারে একেবারে শিশুর ছোটবেলা থেকেই। এ সময় খেলতে খেলতে সন্তানকে পালা করে কাজ করা শেখানো যেতে পারে। শিশু একটি খেলনা নিয়ে খেলতে চাইলে তার সঙ্গে কিছুক্ষণ খেলার পর অভিভাবক অন্য কোনো কার্যক্রমের প্রস্তাব দিতে পারেন। এতে অন্যের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়া ও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়।
শিশুদের অন্যদের সঙ্গে মেশার সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকরা খেলার সময়, সঙ্গী এবং কার্যক্রমের একটি কাঠামো তৈরি করে দিতে পারেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ধীরে ধীরে সন্তানের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্কুলে গিয়ে শেখাতে হবে অন্যের কথা ভাবতে
কিন্ডারগার্টেন ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বয়সে শিশুরা অনেকটাই নিজের প্রতি মনোযোগী থাকে। তাই এ সময় অন্যের অনুভূতি ও প্রয়োজন বোঝার অভ্যাস তৈরি করা দরকার।
সন্তান অন্য কোনো শিশুকে খেলায় একা বসে থাকতে দেখলে তাকে সেই শিশুকে খেলায় যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে সন্তান যে খেলনা বা খেলায় আনন্দ পায়, অন্য শিশুটি সেটি কীভাবে দেখবে, তা ভাবতে বলা যেতে পারে। এতে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার পাশাপাশি সহমর্মিতাও তৈরি হয়।
কৈশোরের শুরুতেই ভালো বন্ধুর বৈশিষ্ট্য বোঝান
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ওঠার পর সমবয়সীদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একদিকে শিশুরা কোনো একটি বন্ধুমহলের সঙ্গে কতটা মানিয়ে নিতে পারছে, অন্যদিকে একান্ত বন্ধুত্ব কতটা গভীর হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ সময় জনপ্রিয়তার বিষয়টিও সন্তানকে বোঝানো দরকার। প্রিনস্টেইনের মতে, জনপ্রিয়তারও ভিন্ন ধরন রয়েছে। কেউ ইতিবাচক, সহমর্মী ও নেতৃত্ব দেওয়ার গুণের কারণে অন্যদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। আবার কেউ আকর্ষণীয়তা, আগ্রাসী আচরণ, প্রভাব কিংবা ‘কুল’ হিসেবে পরিচিত হওয়ার কারণে জনপ্রিয় হতে পারে।
এই পার্থক্য সন্তানকে স্পষ্টভাবে বোঝালে সে বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে কোন ধরনের আচরণকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত, তা বুঝতে পারে।
ভালো বন্ধুত্বের কিছু বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একে অন্যের যত্ন নেওয়া, নিজের দুর্বলতা বা ব্যক্তিগত বিষয় ভাগ করে নেওয়ার মতো আস্থা, বিশ্বাস ও বিশ্বস্ততা এবং কঠিন সময়ে বন্ধুকে সহযোগিতা করা। সন্তানকে এসব গুণসম্পন্ন বন্ধু বেছে নিতে এবং নিজেও এমন বন্ধু হতে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
বন্ধুর চাপে নিজের পরিচয় যেন হারিয়ে না যায়
বয়ঃসন্ধিকালে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্ব আরও জটিল হয়ে ওঠে। গভীর বন্ধুত্ব, প্রেমের সম্পর্ক এবং সমবয়সীদের চাপ একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করে। এ সময় সন্তানকে নিজের পরিচয় ও মূল্যবোধ ধরে রাখার বিষয়ে উৎসাহ দেওয়া জরুরি।
প্রিনস্টেইন বলেন, এই বয়সে সামাজিক ও নিজের পরিচয় নিয়ে উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। তাই সন্তানকে বোঝানো যেতে পারে, অন্য কিশোর-কিশোরীরাও নিজেদের নিয়ে একই ধরনের চিন্তা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যায়।
একই সঙ্গে বন্ধুর চাপে নিজের মূল্যবোধ থেকে সরে না যাওয়ার বিষয়টিও শেখাতে হবে। গবেষণা অনুযায়ী, বন্ধুত্ব ও অন্যদের সঙ্গে মিশে চলা কিশোর বয়সে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সন্তানদের মূল্যবোধ গড়ে ওঠে অনেক সময় সমবয়সীদের চাওয়া এবং বাবা-মায়ের চাওয়ার মাঝামাঝি অবস্থানে।
শেষ পর্যন্ত সন্তানের সমবয়সীদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে অভিভাবকের চেয়ে সে নিজেই বেশি জানে। তাই ধীরে ধীরে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তাকে জানাতে হবে, প্রয়োজন হলে বাবা-মা পরামর্শ ও সহযোগিতার জন্য পাশে আছেন।
প্রিনস্টেইনের মতে, ছোটবেলায় সন্তানকে যে সামাজিক দক্ষতা শেখানো হয়, তা পরবর্তী জীবনের ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্কেও কাজে লাগে। তাই সন্তানকে অন্যের প্রতি বিবেচনাশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আচরণ করতে শেখানোর পাশাপাশি ছোটবেলাতেই সেই আচরণের জন্য তাকে উৎসাহ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন
/অ